দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা সম্পর্কে জেনে নিন
দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা সে প্রসঙ্গ সম্পর্কে বিস্তারিত বিষয়বস্তু নিয়েই থাকছে আমাদের আজকের মূল আলোচনা। সাথেই আপনাদের জন্য আরও থাকছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার গুরুত্ব সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য সমূহ। তাই আমাদের আজকের পোস্টটি অবশ্যই সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পড়ুন যেন প্রমিত ভাষার যাবতীয় বিষয় এবং তার ও চর্চা সম্পর্কে বিশদ তথ্য পেতে পারেন।
প্রমিত ভাষায় কথা বললে সব অঞ্চলের মানুষ সহজে বুঝতে পারে বলে আঞ্চলিক ভাষার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে এই ভাষা নির্ধারিত হয়।তাই আজকের পোস্টে দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা সেই বিষয় সম্পর্কে বিশদভাবে সকল তথ্য আপনাদেরকে জানানোর চেষ্টা করব। আশা করছি আপনারা ধৈর্য সহকারে আজকের পোস্টটি শেষ পর্যন্ত পড়বেন।
ভূমিকা
প্রমিত ভাষা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের বা জনগোষ্ঠীর ভাষার সেই রূপ, যা উচ্চারণ, ব্যাকরণ এবং ব্যবহারিক নিয়মাবলীর দিক থেকে সকলের কাছে সহজবোধ্য এবং গ্রহণযোগ্য। এটি একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত ভাষা, যা শিক্ষিত সমাজের ব্যবহারে প্রতিফলিত হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের মধ্যে সঠিক যোগাযোগ স্থাপন করে।
দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা শিক্ষার বাইরে সামাজিক, পেশাগত, এবং সাংস্কৃতিকক্ষেত্রে ব্যবহৃত ভাষার শৃঙ্খলা রক্ষা করে। প্রমিত ভাষার রূপ ও বৈশিষ্ট্য মূলত ব্যাকরণ, শব্দচয়ন, এবং গঠনগত শুদ্ধতায় নির্ভরশীল। এর ইতিহাস দীর্ঘ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে এটি শুধুমাত্র শিক্ষার জন্য নয়, বরং লেখালেখি, প্রশাসনিক কাজ, এবং গণমাধ্যমে ব্যবহৃত হয়।
প্রমিত ভাষা কি
মান্য ভাষা বা প্রমিত ভাষা হল ভাষার একটি নির্ধারিত রূপ যা নির্দিষ্ট ব্যাকরণিক ও উচ্চারণগত নিয়ম অনুসরণ করে। এটি ভাষার প্রকৃতি ও গঠনগত বিশুদ্ধতার মানদণ্ড রক্ষা করে। সহজভাবে বলা যায়, প্রমিত ভাষা হল সেই ভাষা যা শিক্ষা, প্রশাসন, এবং যোগাযোগের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্ভুল ও শুদ্ধ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত।
অন্যকথায়, একটি প্রমিত ভাষা (বা প্রমিত উপভাষা, প্রমিত বৈচিত্র্য) হল কোনও ভাষার এমন একটি রূপ যা তার ব্যাকরণ, শব্দভাণ্ডার, লিখনরীতি এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত এবং কোডিফাই করা হয়েছে। এটি সাধারণত একটি ভাষার বিভিন্ন রূপের মধ্যে আলাদা এবং একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
আরো পড়ুনঃ দোভাষী পুঁথি বলতে কী বোঝায়
ভাষার আদর্শ রূপ বলা হয় প্রমিত ভাষাকে। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে, ঢাকার ভাষাকে প্রমিত বাংলা হিসেবে ধরা হয়। কারণ এটি ব্যাকরণসম্মত এবং অধিকাংশ মানুষের মধ্যে স্বীকৃত। এটি আঞ্চলিক ভাষার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ও সহজবোধ্য।
শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার গুরুত্ব
প্রমিত ভাষা একটি ভাষার সর্বজনীনভাবে গৃহীত ও নিয়ন্ত্রিত রূপ, যা লেখায় এবং কথায় সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, প্রমিত ভাষা সঠিক যোগাযোগ নিশ্চিত করে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মধ্যে স্পষ্ট ও নির্ভুল বার্তা আদান-প্রদান সম্ভব হয় প্রমিত ভাষার মাধ্যমে। এটি জ্ঞানের সঠিক পরিবেশনে সহায়ক।
দ্বিতীয়ত, প্রমিত ভাষা শিক্ষার্থীর ব্যাকরণিক শুদ্ধতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি শিক্ষার্থীদের লেখায় এবং কথায় শৈলী ও শুদ্ধতা আনে। প্রমিত ভাষার ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা ভাষার সৌন্দর্য ও শৈলীর প্রতি সচেতন হয়, যা তাদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়ায়।
তৃতীয়ত, প্রমিত ভাষার ব্যবহার আঞ্চলিক ভাষার ভিন্নতাকে একীভূত করে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীরা একই মানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং বিষয়টি সবার জন্য সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক মান বজায় রাখতে সহায়ক।
চতুর্থত, প্রমিত ভাষা শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব উন্নত করে। সঠিক উচ্চারণ ও ব্যাকরণিক শুদ্ধতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এটি কর্মজীবনে সুবিধা এনে দেয়, যেমন চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি এবং পেশাগত উন্নতি।পঞ্চমত, প্রমিত ভাষার ব্যবহার সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তোলে। এটি বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করে এবং সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে।
আরো পড়ুনঃ দোভাষী পুঁথির উল্লেখযোগ্য কবি কারা
উপসংহারে, শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এটি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন, ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার ব্যবহার শুধুমাত্র পঠনপাঠনের জন্য নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও সংস্কৃতিমনস্ক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে অপরিহার্য।
প্রমিত ভাষার রূপ
প্রমিত ভাষার রূপ তিনটি প্রধান দিক থেকে গঠিত। ভাষার উচ্চারণ, শব্দচয়ন বা নির্দিষ্ট মানের শব্দ ব্যবহারে গুরুত্ব, এবং বাক্য গঠন। এই তিনটি দিকই প্রমিত ভাষাকে আঞ্চলিক বা কথ্য ভাষার থেকে আলাদা করে তোলে। বাংলা ভাষায় প্রমিত রূপে শুদ্ধ উচ্চারণ, সঠিক শব্দের প্রয়োগ এবং বাক্যের সরলতা ও সুসংগঠিত রূপ বজায় রাখা হয়। এর ফলে ভাষা স্পষ্ট, পরিষ্কার এবং শুদ্ধভাবে প্রতিফলিত হয়। প্রমিত ভাষার দুটি রূপ রয়েছে।
- কথ্য প্রমিত ভাষাঃ এটি আনুষ্ঠানিক কথা বলার জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে ভাষার শুদ্ধতা ও ব্যাকরণিক নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।
- লেখ্য প্রমিত ভাষাঃ এটি লিখিত যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেমন সংবাদপত্র, বই, বা সরকারি নথিতে।
উদাহরণস্বরূপ, আঞ্চলিক ভাষায় কেউ বলতে পারে, "আমরা বই পড়ি না", তবে প্রমিত ভাষায় এটি হবে, "আমরা বই পড়ি না।" এখানে উল্লিখিত বাক্যে উচ্চারণগত এবং গঠনগত পার্থক্য রয়েছে, যা প্রমিত ভাষার শুদ্ধতা এবং স্পষ্টতাকে প্রতিফলিত করে। প্রমিত ভাষার এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিকতা এবং মান নিশ্চিত করে, এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে একযোগিতার সৃষ্টি করে।
প্রমিত ভাষার ইতিহাস
প্রমিত ভাষার ইতিহাস বহু প্রাচীন এবং এটি ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রমিত রূপ গঠন হয় ঊনবিংশ শতকে, যখন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন হিসেবে ৮ম শতাব্দীতে বৌদ্ধ পণ্ডিত-কবি কাহ্নপাকে বাংলা ভাষার জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যিনি প্রথম পদ রচনা করেন।
ঊনবিংশ শতকের আগে বাংলায় আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এত বেশি ছিল যে, সাধারণ মানুষ একে অপরের কথা সহজে বুঝতে পারত না। এই প্রেক্ষাপটে প্রমিত ভাষার প্রবর্তন মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে, প্রমিত ভাষা শিক্ষার, সাহিত্য ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে, যা বাংলা ভাষার উন্নতি এবং প্রসার ঘটায়।
প্রমিত ভাষার উদ্ভব সাধারণত দুটি প্রক্রিয়ায় হয়ঃ
- স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজির ক্ষেত্রে ভাষার প্রমিতকরণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং পর্যায়ক্রমে ঘটে, যেখানে আনুষ্ঠানিক সরকারি হস্তক্ষেপ ছিল না।
- ফরাসি ও স্প্যানিশ ভাষার ক্ষেত্রে প্রমিতকরণ আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হয়, এবং নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় হয়। আজকের দিনে, প্রমিত ভাষা একাডেমিক ও সামাজিক জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা
প্রমিত ভাষার চর্চা কেবল আমাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে উন্নয়ন ঘটায় না, বরং সমাজে আমাদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ায়। প্রমিত ভাষার সঠিক চর্চা আমাদের যোগাযোগ, চিন্তাভাবনা এবং আত্মবিশ্বাসকে সুদৃঢ় করে।
প্রমিত ভাষার চর্চার প্রয়োজনীয়তা
দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- অফিস, স্কুল, বা সামাজিক অনুষ্ঠানে সঠিকভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে প্রমিত ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের বক্তব্যকে সহজবোধ্য এবং প্রভাবশালী করে তোলে।
- প্রমিত ভাষার ব্যবহার আমাদের আরও মার্জিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে। আঞ্চলিক ভাষার চেয়ে প্রমিত ভাষা অধিকাংশ মানুষের কাছে বোধগম্য হওয়ায় এটি সামাজিক যোগাযোগকে সহজ করে।
- চাকরির সাক্ষাৎকার থেকে শুরু করে অফিসের কাজ, কর্পোরেট উপস্থাপনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার ব্যবহার অত্যাবশ্যক। এটি পেশাগত জীবনে দক্ষতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে।
- প্রমিত ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে চিন্তাভাবনার শৃঙ্খলতা আসে এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। এটি আমাদের কথোপকথনকে বোধগম্য এবং আকর্ষণীয় করে তোলে।
প্রমিত ভাষা ব্যবহারের নিয়মাবলি
- প্রমিত ভাষায় শব্দের উচ্চারণ ও প্রয়োগে শুদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, “বই” শব্দটিকে শুদ্ধভাবে “বই” হিসেবে উচ্চারণ করতে হবে, “বৈ” হিসেবে নয়।
- বাক্যের সঠিক গঠন যোগাযোগকে আরও কার্যকর করে। যেমন, “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বাক্যটি সঠিক গঠনের উদাহরণ।
- প্রমিত ভাষায় অশোভন বা অপ্রয়োজনীয় শব্দ পরিহার করে পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত শব্দ ব্যবহার করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, “ত্রুটি” শব্দটি “ভুল” শব্দের চেয়ে মার্জিত।
- প্রমিত ভাষা ব্যবহারের সময় বানান, উচ্চারণ, এবং বাক্যগঠনে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। ভুলভ্রান্তি এড়িয়ে চলার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রমিত ভাষার অভ্যাস তৈরি
প্রমিত ভাষায় কথা বলার দক্ষতা অর্জন চর্চার ওপর নির্ভরশীল। যাঁরা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত, তাঁদের জন্য প্রথমে এটি চ্যালেঞ্জিং মনে হতে পারে। তবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে এটি সহজ হয়ে যায়। যেমন, প্রতিদিন সাধারণ কথোপকথনে প্রমিত শব্দের সঠিক উচ্চারণ ও ব্যবহারে মনোযোগ দিলে অভ্যাসটি গড়ে ওঠে। অতএব, দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা আমাদের যোগাযোগ দক্ষতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পেশাগত সফলতার ভিত্তি গড়ে তোলে। এটি আমাদের ব্যক্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী করে তুলতে সহায়ক।
প্রমিত ভাষার ব্যবহার
প্রমিত ভাষার ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং বিভিন্ন পেশাগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অপরিহার্য। এটি যোগাযোগের শুদ্ধতা নিশ্চিত করে এবং একটি উন্নত ও সংগঠিত সমাজ গঠনে সহায়তা করে। তাই দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা করা জরুরি। বিশেষত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা অফিস-আদালতে প্রমিত ভাষার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কাজকর্ম, নথিপত্র প্রস্তুতি কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রমিত ভাষায় সম্পাদিত হয়। প্রমিত ভাষার ব্যবহার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
- বিদ্যালয়, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের সময় প্রমিত ভাষা অপরিহার্য। শিক্ষকের সঠিক উচ্চারণ এবং শুদ্ধ বাক্যগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রমিত ভাষার ব্যবহার শিখে থাকে। এটি শিক্ষার মান উন্নত করে এবং শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা গড়ে তোলে।আর শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার গুরুত্ব সম্পর্ক সচেতন করে।
- সরকারি নথিপত্র, চিঠিপত্র, এবং প্রতিবেদন প্রমিত ভাষায় রচিত হয়। এটি শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রমকেই সহজ করে না, বরং ভাষার শৃঙ্খলা ও স্পষ্টতা নিশ্চিত করে।
- সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রমিত ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে প্রমিত ভাষা তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং শ্রোতাদের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করে।
- সাহিত্য রচনা, নাটক, মঞ্চনাটক, এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রমিত ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কাহিনি বা বার্তার মূল ভাব বজায় রাখে এবং শ্রোতাদের মধ্যে সংবেদনশীল প্রভাব সৃষ্টি করে। প্রমিত ভাষা কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং শৃঙ্খলার প্রতীক।
- এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্ব বহন করে। ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার আমাদের চিন্তাভাবনার গভীরতা বাড়ায় এবং সামাজিক মর্যাদাকে উন্নত করে। প্রমিত ভাষার যথাযথ প্রয়োগ একটি উন্নত ও সাংগঠনিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা আমাদের ভাষার শুদ্ধতা, শিক্ষাগত উন্নয়ন, এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রমিত ভাষার গুরুত্ব থাকায় এটি শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পেশাজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার শুদ্ধতা ও গুণগত মান বজায় রাখতে প্রমিত ভাষার নিয়মিত চর্চা করা উচিত। এটি আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
প্রমিত ভাষার বৈশিষ্ট্য
প্রমিত ভাষার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা এটিকে অন্যান্য ভাষার রূপ থেকে পৃথক এবং স্বতন্ত্র করে তোলে। এর মধ্যেকার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নে দেয়া হলো।
- প্রমিত ভাষার উচ্চারণ থাকে নির্ভুল এবং সঠিক, যার ফলে এটি বোঝার ক্ষেত্রে কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় না। তবে দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা আমাদের উচ্চারণে নির্ভুলতা আনতে সাহায্য করে।
- প্রমিত ভাষায় বাক্য গঠন এবং শব্দচয়ন সবসময় ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে হয়, যা ভাষার শুদ্ধতা নিশ্চিত করে।
- প্রমিত ভাষা এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে এটি সাধারণ জনগণের জন্য সহজে বোধগম্য। এটি একটি ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, কারণ এর মাধ্যমে একে অপরকে সহজে এবং স্পষ্টভাবে বোঝানো যায়।
- প্রমিত ভাষা আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্য থেকে মুক্ত থাকে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগণের কথ্য ভাষা অনুসরণ করে না।
- প্রমিত ভাষা শিক্ষাক্ষেত্র, প্রশাসন এবং মিডিয়াতে ব্যবহৃত হয়, যা তার সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে। এটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
- এছাড়া, প্রমিত ভাষা সাধারণত একটি ভাষার লিখিত রূপের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এবং এটি অন্যান্য আঞ্চলিক বা উপভাষার রূপ থেকে পৃথক। উদাহরণস্বরূপ, "তুমি খাইছো?" (আঞ্চলিক ভাষা) এর পরিবর্তে প্রমিত ভাষায় হবে "তুমি খেয়েছো?"।
প্রমিত ভাষার বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম, প্রমিত ভাষা ব্যবহারে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একে অপরের সাথে সহজে যোগাযোগ করতে পারে। এটি শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক, কারণ প্রমিত ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে সঠিক তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব।সরকারি কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি পায় প্রমিত ভাষার ব্যবহারে।
বাংলাদেশে, বাংলা ভাষার প্রমিত রূপ হলো ঢাকার উপভাষা, যা শিক্ষা, সরকারি কাজ ও মিডিয়াতে ব্যবহৃত হয়। একইভাবে, দিল্লির উপভাষা হিন্দি ভাষার প্রমিত রূপ এবং ব্রিটিশ ইংরেজি ও আমেরিকান ইংরেজি ইংরেজি ভাষার প্রমিত রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
লেখকের মন্তব্য
আশা করি আজকের পোষ্টের মাধ্যমে আপনারা সকলে দৈনন্দিন জীবনে প্রমিত ভাষার চর্চা তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছেন। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আপনাদের যদি কোন প্রশ্ন বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মতামত আমাদের জানানোর থাকে তাহলে অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করুন এবং আমাদের পোস্টটি শেয়ার করার মাধ্যমে আপনার পরিবার এবং পরিজনের সকলকে প্রমিত ভাষার ব্যবহার,বৈশিষ্ট্য, গুরুত্ব এবং ভাষার চর্চা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যগুলো জানার সুযোগ করে দিন।
ধন্যবাদ
মাহ্ফুজ আইটি বিডির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url